মেনু নির্বাচন করুন

বৃক্ষ রোপনের পর শেষে ছবি

বৃক্ষরোপণ হোক সামাজিক আন্দোলন

চলছে বর্ষাকাল । বৃক্ষ রোপনের উপযুক্ত সময় । বর্ষার শুরুতে মহামন্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের অনেক বিশিষ্টজন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৃক্ষ চারা রোপণ করেন এবং সেটাতে পানি ছিটান । দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতৃবৃন্দের মাত্র কয়েকটি চারা রোপন করার মাধ্যমে পুরো দেশবাসীর বৃক্ষ রোপণ সম্পর্কীয় দায়িত্ব পালন শেষ হয়ে যায় না ।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয় থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং গোটা দেশবাসীকে গাছ লাগানো সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় সে উদ্যোগ সীমিত । আবার আনুষ্ঠানিক শোভা যাত্রা করে ‘গাছ লাগাই পরিবেশ বাঁচাই’ স্লোগানের মাধ্যমে মিডিয়ার উপস্থিতিতে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় যে বৃক্ষ চারাটি রোপন করা হয় পরবর্তীতে সে চারাটিরও কোন যত্ন নেয়া হয় না ।

তাই দেখা যায় বর্ষার মওসুম আসলেই বৃক্ষ রোপণের জন্য যারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাদের অধিকাংশ সংখ্যকেই সারা বছরেও একবার রোপিত সে বৃক্ষটির খোঁজ নেন না । যার ফলে অযত্নে চারাটির আর বেড়ে ওঠা হয় না । সেটা কোন পশুর খাদ্য কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়ে যায় । সরকারী উদ্যোগে গাছ লাগানো কর্মসূচীতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ এবং খরচ হলেও টাকা বিনিয়োগের তুলনায় উপকার হয় সামান্যই । তবে যদি বন বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে বনায়ণের সাথে সম্পৃক্ত সকলেই বৃক্ষ রোপণের গুরুত্ব ও উপকারীতা সম্মন্ধে সচেতন হয় বা সচেতন করা যায় তবে তা দেশবাসীর অস্তিত্ব বা জীবন রক্ষায় বৃক্ষরাজি প্রধান ভূমিকা পালন করবে ।

আশার কথা, মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হতে শুরু করেছে । নিজেকে নিয়ে মানুষ এখন ভাবতে শিখেছে । কি খাবে, কি খাবে না এ নিয়ে মানুষের সচেতনতার সীমা নাই । অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের পরিমান কিভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে মানুষের সামান্য মাথা ব্যাথা নাই । গাছকে মানুষের সবচেয়ে উপকারী বন্ধু বলা হয় কেননা গাছ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ।

বাংলাদেশকে সবুজ শ্যামল প্রকৃতির দেশ বলা হলেও এখানে প্রয়োজনের তুলনায় সবুজের পরিধি খুবই কম । পরিবেশবাদীদের মতে, একটি দেশের মোট ভূমির ২৫% বনভূমি থাকা আবশ্যক অথচ বাংলাদেশে সে পরিমান বনভূমি নাই । সরকারী হিসেবে মতে বাংলাদেশে বনভূমির পরিমান মাত্র ১৭.৫০% । সরকারী হিসেবে মতে, বাংলাদেশে মোট বনভূমি ২৫ লাখ হেক্টর বা ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার অর্থ্যাৎ মাথাপিচু মাত্র ০.০২ হেক্টর । সরকারী হিসেবের চেয়ে ইউনোস্কোর হিসেবে বনভূমির পরিমান আরও কম । বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমান মাত্র ১০% ।

বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমিকে ৪ ভাগে ভাগ করা যায় । যার মধ্যে পাহাড়ি বনভূমির আয়তন ১৩,৩৫৫ বর্গমাইল, ম্যানগ্রোভ বনভূমির পরিমান ৭,৪১২ বর্গমাইল, সমতল ভূমির বনভূমির পরিমান ১,২১৪ বর্গমাইল এবং গ্রামীণ বনভূমির পরিমান ২,৭১১ বর্গমাইল । অত্যন্ত দূর্ভাগ্যের হলেও দেশের ২৮টি জেলায় সরকারি বনভূমি নাই । পরিবেশর জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমি আছে মাত্র ৭টি জেলায় ( চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবন, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা ) ।

দেশের বাকী ৩০টি জেলায় প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য বনভূমি রয়েছে । সরকার কর্তৃক দেশের উপকূলীয় ১২ জেলায় সবুজ বেষ্টনী ঘোষণা করা হলেও তা রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে ধ্বংস হতে শুরু করেছে । বিভাগ অনুযায়ী বনভূমির পরিমান হল, চট্টগ্রামে ৪৩%, খুলনায় ৩৮%, ঢাকায় ৭%, সিলেটে ৬%, বরিশালে ৩% এবং রাজশাহীতে মাত্র ২% । পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, শুধু চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগ ছাড়া অন্য বিভাগের মানুষ পরিবেশগত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে ।

দেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী বনায়ণ ধ্বংসে যেমন দেশের মানুষ ভূমিকা রাখছে তেমনি বর্হিবিশ্বের পরাশক্তিসমূহের অপতৎপরাতাও কম নয় । আমারা বনায়ণ ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে পড়েছি । আবাসনের নাম করে অপরিকল্পিত ভাবে বনায়ণ ধ্বংস করছি । এছাড়া জ্বালানী হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত কাঠ ধ্বংস করছি ।

বন মন্ত্রনালয় নির্ধারিত স্লোগান ‘একটি গাছ কর্তন করল দুটি গাছ রোপন করব’ কে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না । বনায়ণ ধ্বংসের এ মহাযজ্ঞের কুফল বর্তমানে উপলব্ধি করতে না পারলেও নিকট ভবিষ্যতে এটা আমাদের জন্য দুর্যোগ বয়ে আনবে । এছাড়াও ২০০২ সালের ১লা মার্চ পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করা হলেও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ার কারনে রোপিত বৃক্ষ বৃদ্ধি পাচ্ছে না ।

বিশ্বের পরাশক্তিসমূহ তাদের রাসয়নিক অস্ত্র কারখানায় পারমানবিক চুল্লি ব্যবহার এবং অন্যন্য কারখানা থেকে নির্ঘমিত কালো ধোঁয়া পরিবেশকে ভয়াবহভাবে দুষিত করছে । যার প্রভাবে বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ উপকূলীয় বনাঞ্চলের বৃক্ষসমূহ বিপদজনক ভাবে মরে যাচ্ছে । এ কারনে বিশ্ব জলবায়ু এবং প্রাণী অস্তিত্বের জন্য বাংলাদেশ খুবই বিপদ জনক সীমারেখায় রয়েছে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মত দিয়েছেন।

বৃক্ষ রোপন ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারের সাথে ব্যক্তিকেও সম্পৃক্ত হতে হবে । অন্য কোন স্বার্থে না হোক অন্তত নিজেদের অস্তিত্বসহ সকল প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বেশি করে বৃক্ষ রোপণ করা আবশ্যক । বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে বৃক্ষ রোপন করার উপযুক্ত সময় । সুতরাং বসত ভিটার আনাচে-কানাচে যেখানেই খালি জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে বেশি করে বৃক্ষ রোপন করতে হবে । বেশি সম্ভব না হোক অন্তত প্রত্যেকের উচিত একটি ফলজ, একটি বনজ এবং একটি ঔযুধি বৃক্ষ রোপন করা ।

আগামী প্রজন্মকে সুস্থ বিকাশের সুযোগ করে দিতে এ কর্তব্যটুকু পালন করা রাষ্ট্রের সকল সুনাগরিকের উচিত । সরকারও বৃক্ষ রোপনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে । তাইতো বাংলাদেশ সরকার দেশের বনভূমিকে সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ গ্রহন করেছে । সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের বনভূমিকে ২০% উন্নীত করার লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে কাজ করছে ।

কাজেই আমাদের উচিত এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করা । আমাদের কিংবা সরকারের ব্যর্থতায় যদি এ উদ্যোগ সফল না হয় তবে দেশে বন্যা, খরা, সাইক্লোন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রাদুর্ভাব অতিমাত্রায় বেড়ে যাবে । যার ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন ধ্বংস হবে তেমনি আমাদের জীবনও হুমকির মূখে পরবে ।

কাজেই ১৯৯০ ও ২০০২ সালে প্রণীত বন সংরক্ষন আইনের আওতায় এসে দেশের বনভূমির পরিমানকে অন্তত ২৫% উন্নীত করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই । চলতি ২০১৫ সালের বর্ষা মওসুমে দেশের ১৬ কোটি মানুষ যেন ৪৮ কোটি বৃক্ষ চারা রোপন করে দেশের পরিবেশ রক্ষার কাজ শুরু করতে পারি সে ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করি ।


Share with :

Facebook Twitter